◼ নবী করীম (ﷺ) এর জিহবা মােবারক অত্যন্ত পবিত্র, জ্ঞান ও সাহিত্যের, ভাষার সাবলীলতা ও অলংকারিত্বের, হক্ব ও সত্যতার, বিনয় ও ভালবাসার প্রস্রবণ ও বিকাশস্থল ছিল। তাঁর (ﷺ) এর কথা মধুর মত মিষ্ট ছিল। হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী, উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট এবং যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত অর্থাৎ সীমালংঘন, সীমাহ্রাস, মিথ্যা, গীবত, দূর্ব্যবহার ও অশীল বাক্যালাপ ইত্যাদি থেকে মুক্ত ও পবিত্র ছিল। তাঁর কথামালা যেন মুক্তার ন্যায় ঝড়ে পড়ছে। ৪৭
◼ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে (ﷺ) এমন জ্ঞান দান করেছেন যাতে প্রত্যেক ভাষার পারিভাষিক বৈশিষ্ট্য সহকারে তিনি কথা বলতে পারতেন। যখন তিনি অন্য ভাষায় কথা বলতেন তখন সে ভাষার ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্য ও অলংকার অনুযায়ী বলতেন যা শুনে ভাষাবিদগণ অবাক হয়ে যেতাে। কোন ব্যক্তি যখন নিজ দেশের ভাষায় কথা বলতেন নবী করীম (ﷺ)ও তাঁর দেশের ভাষায় কথা বলতেন। এটা ছিল তাঁর জিহবা মােবারকে আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তি ও ক্ষমতা। ৪৮
৪৭. ‘আল্লামা যারক্বানী : প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৯৯।
৪৮. কাজী ‘ইয়া : আশ-শিফা, খ. ১, পৃ. ৪৪।
◼ হযরত সালমান ফারসী (রা.) তাঁর জীবন বৃত্তান্ত নবী করীম (ﷺ)কে শুনালেন এক ইয়াহুদী দোভাষীর মাধ্যমে, হযরত সালমান ফারসী নবী করীম (ﷺ) -এর প্রশংসা করলেন এবং ঐ সমস্ত লােকদের দূর্নাম করলেন যারা তাঁকে তাঁর (ﷺ) নিকট আসতে বারণ করেছিল। দোভাষী মনে মনে বলল, নবী করীম (ﷺ) তাে ফার্সী জানেন না, তাই সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল, হে মুহাম্মদ ! সালমান তাে আপনাকে মন্দ বলেছে। তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন সে তাে আমার প্রশংসা করেছে। এবং ঐ কাফিরদের দুর্নাম করেছে যারা মানুষকে আমার কাছে আগমন করতে বারণ করে। এ কথা শুনে ইয়াহুদী বললেন,
فقال اليهودی یامحمد قد كنت قبل هذا اتهمك والان تحقق عندی انك رسول اللّٰه واشهد ان لا اله الا اللّٰه وأشهد انك رسول اللّٰه -
হে মুহাম্মদ ! নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে আমি আপনাকে মন্দ জানতাম, এখন আমার কাছে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। অতএব, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আরাে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। ৪৯
◼ প্রত্যেক জীব-জন্তুর ভাষা নবী করীম (ﷺ) বুঝতেন এবং তাদের সাথে কথা বলতেন, যেমন বনের হরিণী সাক্ষ্য দিল
اشهد ان لااله الا اللّٰه وانك رسول اللّٰه .
নবী করীম (ﷺ) এর অনুরােধে বেদুইন হরিণীকে ছেড়ে দিল, অতঃপর হরিণী মুক্ত হতেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে খুব দ্রুত পদে লাপিয়ে লাপিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল এবং এটা বলছিল আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই আর আপনি আল্লাহর রাসূল। ৫০
◼ সেদিকে ইঙ্গিত করে ইমাম আযম (রহ.) বলেন, ৫১
(১) و الذئب جاءك و الغزالة قد اتت + بك تستجيرو تحتمي بحماك
(2) وكذا الوحوشى اتت اليك و سلمت + و شكا البعير اليك حين راك
(৩) ودعوت اشجارا اتتك مطيعة + و سعت اليك مجيبة لنداك
(8) و عليك ظللت الغمام في الوری + و الجزع حن الى كريم لقاك
১. নেকড়ে বাঘ আপনার কাছে এসে আপনার সত্যায়ন করেছে, হরিণী বন্দী অবস্থায় আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করেছে এবং সে আপনার সুপারিশে মুক্তি পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিল।
২. অনুরূপভাবে বন্য পশুরা এসে আপনাকে সালাম করেছে এবং উট যখন আপনাকে দেখেছে, তখন আপনার সমীপে আর দূরাবস্থার অভিযােগ করেছে।
৩. আপনি বৃক্ষরাজিকে ডেকেছেন, তখন সে গুলাে আদেশ পালন করতঃ আপনার সমীপে দৌড়ে উপস্থিত হয়ে যায়।
৪. আর মেঘমালা আপনাকে ছায়া দিয়েছে এবং উস্ক্রনে হান্নানা আপনার বিরহে কেঁদেছে।
◼ ইমাম সুয়ূত্বী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, ৫২ নবী করীম (ﷺ) ছয়জন সাহাবীকে একই দিনে বিভিন্ন দেশের বাদশাহদের দরবারে পাঠালেন, অতঃপর তাঁদের মধ্যে প্রত্যেকে না পড়ে না শিখে সেদশের ভাষায় কথা বলতে শুর করলেন।
أن النبي صلى اللّٰه عليه وسلم لما وجه رسله الى الملوك فخرج ستة نفر منهم فی یوم واحد فاصبح کل رجل منهم يتكلم بلسان القوم الذين بعثه اليهم -
তাঁর (ﷺ) এর জিহ্বা মােবারকের এমনই প্রভাব ছিল যে, তিনি যা বলতেন তা-ই হয়ে যেত। তাঁর কথার ব্যত্যয় ঘটত না। জনৈক ওহি লেখক পরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, নবী করীম (ﷺ) তার ব্যাপারে বললেন, ان الارض لا تقبله এ মাটি তাকে গ্রহণ করবে না।
তার মৃত্যুর পর দেখা গেল তাকে দাফন করার পর মাটি তাকে উপরে তুলে দিয়েছে। ৫৩
◼ এক ব্যক্তি অহংকার বশতঃ বাম হাতে খাবার খাচ্ছিল নবী করীম (ﷺ) বললেন, ডান হাতে খাও। সে বলল, ডান হাতে খেতে পারি না। তিনি (ﷺ) বললেন, এ রূপ হয়ে যাও। ফলে তার ডান হাত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। ৫৪
◼ এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হজ্ব কি প্রত্যেক বৎসর ফরয ? নবী করীম (ﷺ) ফরমালেন, قال لا ولو قلت نعم لوجبت - না, আর আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম তাহলে প্রত্যেক বৎসর ফরয হয়ে যেতাে। ৫৫
৪৯. হালবী : সিরাতুল হালবিয়া, খ. ১, পৃ. ১৮২।
৫০. ‘আল্লামা যারক্বানী : প্রাগুক্ত, খ, ৫, পৃ. ১৫০; আবু নুআইম ইস্পাহানী ; দালাইলুন নবুয়্যত, পৃ. ৩২০।
৫১. ইমাম আ'যম : কৃাসীদায়ে নােমান।
৫২. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী : প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২।
৫৩. মিশকাতুল মাছবীহ : পৃ. ৫৩৫। ৫৪, মিশকাতুল মাছবীহ : পৃ. ৫৩৬। ৫৫. মিশকাতুল মাছবীহ : পৃ. ২২০-২২১।
◼ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ৫৬
এক সফরে আমরা নবী করীম (ﷺ) এর সাথে ছিলাম। চলার সময় তিনি ইমাম হাসান ও হােসাইন (রা.)-এর ক্রন্দনের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ফাতিমা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলেরা কাঁদছে কেন ? তিনি (রা.) বললেন, পিপাসার কারণে। তিনি (ﷺ) সকলকে আওয়াজ দিয়ে ফরমালেন, কারাে কাছে পানি আছে? কিন্তু কারাে নিকট পানি ছিল না। তিনি হযরত (ﷺ) ফাতেমাকে বললেন, এক জনকে আমার কাছে দাও। তিনি দিলেন, তিনি (ﷺ) তাকে নিয়ে তাঁর বুক মােবারকে জড়িয়ে ধরলেন। বাচ্চাটি সে সময় খুবই ক্রন্দন করছিল। তখন তিনি (ﷺ) নিজ জিহবা মােবারক বের করে মুখে দিলেন। তিনি চুষতে থাকেন যতক্ষণ না তিনি শাড় হয়ে যান। আর ক্রন্দন করেননি। আর দ্বিতীয়জন যথারীতি ক্রন্দন করছিলেন। তিনি (ﷺ) বললেন, তাঁকেও আমার কাছে দাও। তিনি (রা.) দিলেন, তিনি (ﷺ) তাঁর সাথেও ঐ রূপ করলেন, অতঃপর তাঁরা উভয়ে শাড় হয়ে গেলেন। এরপর তাঁদের ক্রন্দনের আওয়াজ শুনেনি। ৫৭
৫৬. জালালুদ্দীন সুয়ুত্বী : প্রাগুক্ত, খ, ১, পৃ. ৬২।
৫৭. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী : প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬২
তিনি (ﷺ) সকল সৃষ্টির ভাষা জানতেন। সকল সৃষ্টি অপেক্ষা অধিক সাবলীল ভাষী ও অলংকার পূর্ণ বাগ্মী ছিলেন। তাঁর (ﷺ) জিহ্বা মােবারক দিয়ে যা বের হতাে সবই ওহী এবং তাঁর (ﷺ) জিহ্বা দিয়ে যা বের হতাে তা হয়ে যেতাে আর তা আল্লাহরই আইনে পরিণত হতাে।
_________________
কিতাবঃ হৃদয়ের আয়নায় নবী করীম (ﷺ)
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ আবদুল হালিম
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন