৬। ঈমানের ছয়টি মূলনীতির শেষটি হলো وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ – কদর তথা তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপন”। অর্থাৎ, এ কথায় বিশ্বাস করা যে, খায়র (ভালো) ও শার্র (মন্দ) সব-ই আল্লাহতায়া'লার ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণাধীন। আরেক কথায়, সকল মানবের কাছে আগমনকারী ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি আল্লাহতায়া'লার চূড়ান্ত ইচ্ছার অধীন। “কদর” অর্থ একটি পরিমাণের পরিমাপ; সিদ্ধান্ত, আদেশ; আধিক্য ও বিশালতা। কোনো বস্তুর অস্তিত্বের জন্যে খোদা তায়া'লার চিরন্তন ইচ্ছাকে “কদর” (নিয়তি) বলে। কদর সংঘটিত হওয়ার দৃষ্টান্ত, অর্থাৎ, যে বিষয়টি এরাদা করা হয় তাকে ’কাযা’ বলে। কাযা এবং কদর পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়। কাযা-র অর্থ হলো অনন্ত অতীত হতে অনন্ত ভবিষ্যত পর্যন্ত আল্লাহতায়া'লার সৃষ্টি করার এরাদা/ইচ্ছা; আর কদর মানে হলো কাযা’র সাথে সঙ্গতি রেখে কোনো কিছু সৃষ্টি করার নজির, যা কম নয়, আবার বেশিও নয়। অনন্ত অতীতে আল্লাহতায়া'লা জানতেন যা যা সংঘটিত হবে। তাঁর এ জ্ঞানটিকেই “কাযা” ও “কদর” বলে। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকরা এর নামকরণ করেছিলেন “আল্ এনায়াত আল্ আযলীয়্যা।” কাযা হতেই সকল সৃষ্টির উৎপত্তি হয়েছে। অনন্ত অতীতে আল্লাহতায়া'লার জ্ঞানানুসারে বস্তুসমূহের সৃষ্টিকেও কাযা এবং কদর বলে। কদর-এ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সুনিশ্চিতভাবে জানতে হবে যে, যদি অনন্তকালে আল্লাহতায়া'লা কোনো বস্তু সৃষ্টির এরাদা করে থাকেন, তবে তা তাঁর এরাদা অনুযায়ী অস্তিত্বসম্পন্ন হতে বাধ্য — একটুও কম বেশি তাতে হবে না। তিনি যা সৃষ্টি করতে এরাদা করেছিলেন তার অনস্তিত্ব কিংবা তিনি যা সৃষ্টি করতে এরাদা করেন নি তার অস্তিত্ব একেবারেই অসম্ভব।
অনন্তকালে আল্লাহতায়া'লার জ্ঞানে সকল বস্তু, প্রাণী, গাছ-পালা, প্রাণহীন সৃষ্টি, প্রত্যেক জিনিসের অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব, প্রতিটি মানুষের ভালো ও মন্দ কর্ম এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের শাস্তি বিরাজমান ছিল। তিনি সব কিছুই জানতেন অনন্তকালে। অনন্ত অতীত হতে চিরস্থায়ী ভবিষ্যত পর্যন্ত যা যা ঘটবে, তার গুণাবলী, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও প্রতিটি ইতিবৃত্ত অনন্ত অতীতে তাঁর জ্ঞানের সাথে সঙ্গতি রেখে তিনি-ই সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সকল সৎ ও বদ কর্ম, দ্বীন ইসলামে তাদের বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস, তাদের সকল ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত কাজ একমাত্র আল্লাহতায়া'লাই সৃষ্টি করেন। তিনি একাই সৃষ্টি করেন এবং কোনো একটি সাবাব (কারণ)-এর মাধ্যমে তা সংঘটন করেন। তিনি প্রত্যেক জিনিস-ই কার্যকারণের মাধ্যমে সৃষ্টি করেন।
উদাহারণস্বরূপ, আগুন দহন করে। বাস্তবে আল্লাহ্ পাক একাই দহন সৃষ্টি করেন। দহনের ব্যাপারে আগুনের স্বতন্ত্র কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু আল্লাহতায়া'লার আদত (স্বাভাবিক রীতি/প্রথা) এমনই যে, আগুন কোনো কিছু স্পর্শ না করলে তিনি দহন সৃষ্টি করেন না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়া'লা একাই দহন করে থাকেন। তিনি আগুন ছাড়াও দহন সৃষ্টি করতে সক্ষম, কিন্তু এটা তাঁর স্বাভাবিক রীতি যে তিনি আগুন দ্বারা-ই দহন করে থাকেন। যদি তিনি দহন না করার এরাদা করেন, তবে আগুনেও দহন অসম্ভব। তিনি হযরত ইব্রাহীম (عليه السلام)-কে আগুনে দহন করেননি। যেহেতু তিনি তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, সেহেতু তিনি তাঁর স্বাভাবিক রীতিকে নাকচ করেছিলেন।
যদি আল্লাহতায়া'লা এরাদা করতেন, তাহলে তিনি কোনো কার্যকারণ ছাড়াই সকল বস্তু সৃষ্টি করতে পারতেন; দহন ব্যতিরেকে আগুন, খাদ্য ছাড়া ভরণপোষণ সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি মানুষদেরকে কোনো না কোনো মাধ্যম দ্বারা সৃষ্টি করার নেয়ামত দান করেছেন। তিনি কোনো বিশেষ বস্তুকে কোনো বিশেষ মাধ্যম দ্বারা সৃষ্টির এরাদা করেছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে মধ্যস্থতাকারী বস্তুর অন্তরালে লুকিয়ে রেখেছেন। যে ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে কোনো কিছু সৃষ্টির আশা করেন, তিনি মাধ্যমের শরণাপন্ন হন এবং তা হাসিল করেন।
যদি আল্লাহতায়া'লা মধ্যস্থতা দ্বারা তাঁর কর্ম সৃষ্টি না করতেন, তবে কাউকেই কারো প্রয়োজন হতো না; সকলেই আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি প্রার্থনা করতো এবং কোনো কিছুর শরণাপন্ন হতো না। মানুষের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক আর থাকতো না, যথা – মুরব্বি ও শিষ্য, শ্রমিক ও তত্ত্বাবধায়ক, ছাত্র ও শিক্ষক ইত্যাদি। ফলে এই পৃথিবী ও পরবর্তী জগত বিশৃংখল হয়ে যেতো এবং সুন্দর ও কুৎসিত, ভালো ও মন্দ, বাধ্য ও অবাধ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্যই থাকতো না।
যদি আল্লাহতায়া'লা এরাদা করতেন, তবে তিনি তাঁর আদত অন্য কোনো পন্থায় সৃষ্টি করতেন এবং প্রতিটি বস্তুকে এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে সৃষ্টি করতেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি তিনি এরাদা করতেন, তাহলে তিনি এই দুনিয়ার মোহাচ্ছন্ন, মানুষের প্রতি অত্যাচারী, বে-ঈমান কাফেরদেরকে বেহেস্তে প্রবেশাধিকার দিতে পারতেন এবং ঈমানদার, সৎকর্মশীল ও দানশীলদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কতে পারতেন। কিন্তু আয়াত ও হাদীসসমূহ প্রতিভাত করে যে তিনি এ রকম এরাদা করেন নি।
মানুষের সকল ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত কর্ম ও তৎপরতার স্রষ্টা হলেন আল্লাহতায়া'লা। তিনি মানবের মধ্যে তার ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড সৃষ্টির লক্ষ্যে এরাদা (আংশিক স্বাধীন ইচ্ছা) সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাতে করে এর মাধ্যমে মানুষ তার কর্ম সংঘটন করতে সক্ষম হয়। যখন মানুষ কোনো কিছু করতে চায়, তখন আল্লাহতায়া'লা ইচ্ছা করলে তা সৃষ্টি করে দেন। যদি মানুষ না চায় এবং আল্লাহ পাকও এরাদা না করেন, তবে তিনি সৃষ্টি করেন না। আল্লাহতায়া'লা শুধু মানুষের ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতেই সৃষ্টি করেন না, বরং তাঁর ইচ্ছানুযায়ীও সৃষ্টি করেন। আল্লাহতায়া'লার সৃষ্ট মানুষের ইচ্ছাকৃত কর্মগুলোর উপমা হলো আগুনের মতোই, যা কোনো বস্তু স্পর্শ করলে তিনি দহন সৃষ্টি করে দেন; আর আগুন স্পর্শ না করলে তিনি দহন সৃষ্টি করেন না। একইভাবে যখন ছুরি কোনো বস্তু স্পর্শ করে, তখন তিনি কর্তন সৃষ্টি করে দেন। ছুরিটি নয়, বরং তিনি-ই কর্তন করেন। কর্তনের জন্যে ছুরিটিকে তিনি একটি মাধ্যম বানিয়েছেন। আরেক কথায়, তিনি মানুষের ইচ্ছাকৃত কর্মগুলো তাদের ইচ্ছার কারণে (সাবাব) সৃষ্টি করে দেন। তবে প্রকৃতির কর্মকাণ্ড মানুষের ইচ্ছাধীন নয়, বরং আল্লাহতায়া'লা যখন ইচ্ছা করেন তখন-ই অন্যান্য কার্যকারণ দ্বারা তা সৃজিত হয়। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই। তিনি-ই সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, অণুকণা, জীবকোষ, জীবাণু ও তাদের উপাদান সৃষ্টি করেছেন। তথাপি মানুষ ও প্রাণীদের ইচ্ছাধীন কর্মের সাথে প্রাণহীন বস্তুসমূহের কর্মকাণ্ডের পার্থক্য বিরাজ করছে; যখন কোনো মানুষ কিংবা কোনো প্রাণী কোনো কাজ করতে ইচ্ছা পোষণ করে, তখন খোদা তায়া'লা ইচ্ছা করলে সেই মানুষ কিংবা সেই প্রাণীকে কর্ম সংঘটনের ক্ষমতা মঞ্জুর করেন এবং তিনি তা সৃষ্টি করে দেন। মানুষের ক্রিয়া তার ক্ষমতাধীন নয়। প্রাণহীন (জড়) বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে কোনো ইচ্ছা বা পছন্দ সেগুলোর নেই। আল্লাহতায়া'লা আগুনের স্পর্শের মাধ্যমে দহন সৃষ্টি করেন, কিন্তু এতে আগুনের কোনো ইচ্ছা বা পছন্দ নেই।
দুটি কারণে মানুষের ইচ্ছাধীন কর্ম সংঘটিত হয়। প্রথমতঃ মানুষের ইচ্ছা ও ক্ষমতা এর সাথে জড়িত। এ কারণে মানুষের কর্মকাণ্ডকে ’কাসব’ (অর্জন) বলে, যা মানুষের একটি গুণবিশেষ। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহতায়া'লার সৃষ্টি প্রক্রিয়া জারি হয়। মানুষকে ’কাসব’ মঞ্জুর করার জন্যেই আল্লাহতায়া'লার আদেশ-নিষেধ, পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
❏ সুরা সফফাত ৯৬ নং আয়াতে আল্লাহ্ পাক এরশাদ ফরমান, وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
— আল্লাহতায়া'লা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদের ক্রিয়াও সৃষ্টি করেছেন” ।
🔺[২৭] আল কুরআন : আস সফফাত, ৩৭:৯৬।
এ আয়াতটি মানুষের মধ্যে কাসব বা ’এরাদাত-এ-জুযিয়্যার’ (আংশিক স্বাধীন ইচ্ছার) অস্তিত্ব এবং চাপ প্রয়োগের অনস্তিত্ব-ই কেবল প্রতিভাত করে না — যার দরুন ক্রিয়াসমূহ মানুষের প্রতি আরোপিত হয় ও বলা হয় যে “মানুষের কর্ম সংঘটন” — বরং আয়াতটি আরো প্রতিভাত করে যে সকল জিনিস কাযা ও কদরসহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে।
মানুষের দ্বারা ক্রিয়া সৃষ্টির জন্যে প্রথমে তার ইচ্ছার প্রয়োজন হয়। এ ইচ্ছাকে কাসব (অর্জন) বলে। মরহুম আমিদী বলেছেন যে, ক্রিয়া সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাসব প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু এ কথা বলা ভুল নয় যে একটি ইচ্ছাকৃত ক্রিয়া সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাসব কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না – যেহেতু মানুষের ইচ্ছাকৃত ক্রিয়াটি এবং সৃষ্ট ক্রিয়াটি একে অপর থেকে ভিন্ন নয়। অতএব, মানুষ যা কিছু চায়, তার সব-ই সে করতে পারে না। সে যা কামনা করে না তাও সংঘটিত হতে পারে। যদি মানুষ যা চাইতো, তাই করতে সক্ষম হতো এবং যদি সে যা চাইতো না তা সংঘটিত না হতো, তবে সে আর মানুষ থাকতো না, বরং খোদা দাবিদার হতো। আল্লাহতায়া'লা তাঁর সৃষ্ট মনুষ্য জাতিকে দয়া করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করার মতো শক্তি-সামর্থ্য প্রদান করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্যবান ও ধনাঢ্য ব্যক্তি জীবনে একবার হজ্জ করতে সক্ষম; আকাশে রোজার চাঁদ দেখার পর তিনি বছরে এক মাস রোযা রাখতে সক্ষম; তিনি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরযকৃত নামায আদায় করতে পারঙ্গম; নিসাবের পরিমাণ সম্পদ অথবা সম্পত্তি থেকে শতকরা আড়াই ভাগ তিনি গরিব মুসলমানদের মাঝে যাকাত দান করতে সমর্থ। অতএব, মানুষ ইচ্ছা করলেই ইচ্ছাধীন ক্রিয়া সংঘটন করে, আর ইচ্ছা না করলে তা করে না। আল্লাহ্ পাকের মাহাত্ম্য এখানেও উপলব্ধি করা যায়। যেহেতু অজ্ঞ ও আহাম্মকেরা কাযা ও কদরের জ্ঞান উপলব্ধি করতে অক্ষম, সেহেতু তারা আহলে সুন্নাতের উলামামণ্ডলী যা বলেছেন তা বিশ্বাস করে না এবং মানুষের ক্ষমতা ও (আংশিক) স্বাধীন ইচ্ছাকে সন্দেহ করে। তারা মনে করে যে মানুষ তার ইচ্ছাধীন ক্রিয়া সংঘটনের ক্ষেত্রে অপারগ বা প্রভাবিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনভাবে কর্ম সংঘটন করতে অক্ষম দেখে তারা আহলে সুন্নাতকে গালমন্দ করে থাকে। তাদের এই ভ্রান্ত আচরণ প্রতিভাত করে যে তাদেরও স্বাধীন ইচ্ছা ও পছন্দ-অপছন্দ আছে।
একটি ক্রিয়া সংঘটন করা বা না করার ক্ষমতা হলো কুদরত-এর বিষয়। একটি ক্রিয়া সংঘটন করা বা না করার ইচ্ছাকে এরাদা বলা হয়। কোনো কিছুকে গ্রহণ করা বা অস্বীকৃতি না জানানোকে বলা হয় রেযা (সম্মতি)। যখন কোনো কিছুতে ইচ্ছার প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার শর্তে ক্ষমতা ও ইচ্ছা মিলিত হয়, তখন খালক্ (সৃষ্টি) সংঘটিত হয়। যদি প্রভাব বিস্তার ছাড়াই তারা উভয়ে মিলিত হয়, তবে এটাকে বলা হয় কাসব। যদি প্রভাব বিস্তার করা কিংবা না করা কোনো শর্ত না হয়, তবে এটাকে বলা হয় এখতেয়ার। ইচ্ছা পোষণকারী যে কেউই স্রষ্টা নয়। অনুরূপভাবে, ইচ্ছাকৃত সকল বিষয়ে সম্মতি দেয়াও অত্যাবশ্যক নয়। এখতেয়ার ও কাসব (অর্জন) এক সাথে থাকতে পারে। আবার এখতেয়ার ও সৃষ্টিও এক সাথে থাকতে পারে। এ কারণেই আল্লাহতায়া'লাকে খালেক (স্রষ্টা) ও মোখতার (এখতেয়ারসম্পন্ন) বলা হয়; আর মানুষকে বলা হয় কাসেব (অর্জনকারী) ও মোখতার (এখতেয়ার সম্পন্ন)।
আল্লাহতায়া'লা তাঁর বান্দাদের এবাদত ও গুণাহসমূহ এরাদা ও সৃষ্টি করেন। তথাপি তিনি এবাদত-বন্দেগী পছন্দ করেন এবং গুণাহ-খাতা অপছন্দ করেন। তাঁর চূড়ান্ত ইচ্ছা (এরাদা) ও সৃষ্টির দ্বারা-ই সকল বস্তু অস্তিত্ব পায়।
❏ সুরা আন’আমের ১০২ নং আয়াতে তিনি এরশাদ ফরমান, لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ–
“নেই কোনো উপাস্য তিনি ব্যতিরেকে; একমাত্র তিনি-ই সব কিছুর স্রষ্টা” ।
🔺[২৮] আল কুরআন : আল আন’আম, ৬:১০২।
মো’তাযেলা সম্প্রদায় এরাদা (ইচ্ছা) ও রেযা (সম্মতি)-র মধ্যে পার্থক্য বুঝতে অপারগ হয়ে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকা পড়ে গিয়েছিল এবং বলেছিল, “মানুষ নিজেই তার ইচ্ছানুযায়ী ক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে।” ফলে তারা কাযা এবং কদরকে অস্বীকার করে বসে। জবরীয়্যা সম্প্রদায় ছিল পুরোপরিভাবে বিভ্রান্ত। তারা বুঝতে পারে নি যে সৃষ্টি ছাড়াও এখতেয়ার বিরাজ করতে পারে। মানুষের মধ্যে কোনো এখতেয়ার নেই ধারণা করে তারা মানুষকে কাঠ ও পাথরের সাথে তুলনা করেছিল। তারা বলেছিল, “মানুষ পাপী নয়; আল্লাহতায়া'লাই সকল পাপ সংঘটন করেন” (আল্লাহ্ মাফ করুন!)। যদি মানুষের মধ্যে কোনো ইচ্ছা ও এখতেয়ার না থাকতো এবং যদি জবরীয়্যা সম্প্রদায়ের কথা মতো আল্লাহতায়া'লাই ক্ষমতাবলে বদকর্ম ও পাপ সংঘটন করতেন, তাহলে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাহাড় থেকে ফেলে দেয়া মানুষটি এবং চারদিক লক্ষ্য করে হেঁটে নেমে যাওয়া মানুষটির মধ্যে কোনো পার্থক্যই থাকতো না। অথচ প্রথমজন ক্ষমতার জোরে গড়িয়ে নামছে, আর দ্বিতীয়জন তার ইচ্ছা ও এখতেয়ারসহ নামছে। যারা এদের মধ্যকার পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারে না, তারা অদূরদর্শী এবং কুরআনের আয়াতসমূহে অবিশ্বাসকারীও। তারা আল্লাহ্ পাকের আদেশ-নিষেধকে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। মো’তাযেলা ও কাদারীয়্যা সম্প্রদায়ের ধারণানুযায়ী যদি মনে করা হয় যে মানুষ নিজেই তার ইচ্ছা হতে সৃষ্টি করে, তাহলে নিম্নোক্ত আয়াতটি অবিশ্বাস করা হয়, যা ঘোষণা করে,
هُوَ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ –
❏ “আল্লাহ্ একাই সকল বস্তুর স্রষ্টা”।
🔺[২৯] আল কুরআন : আল আন’আম, ৬:১০২।
পাশাপাশি এর দরুন মানুষকেও আল্লাহর শরীকদার বানানো হয়।
মো’তাযেলার মতো শিয়া সম্প্রদায়ও বলে যে মানুষ যা চায়, তা-ই সে সৃষ্টি করতে সক্ষম। এর সমর্থনে তারা বলে যে গাধা যতোই মার খাক না কেন, কখনোই খাল পার হয় না। অথচ তারা একবারও ভেবে দেখে না যে মানুষ যদি কিছু করার ইচ্ছা করে এবং তাতে যদি আল্লাহর ইচ্ছা না থাকে, তাহলে এ দুটো ইচ্ছা এক সাথে হতে পারে না। যদি আল্লাহতায়া'লার এরাদা সংঘটিত হয়, তবে শিয়ারা যা বলছে তা ভ্রান্ত। অর্থাৎ, মানুষ যা চায়, তার সবই সৃষ্টি করতে বা সংঘটন করতে সে পারে না। যদি মানুষের ইচ্ছানুযায়ী সব কিছু ঘটতো যা শিয়ারা দাবি করছে, তাহলে আল্লাহতায়া'লা অক্ষম ও ব্যর্থ হতেন (আল্লাহ্ মাফ করুন!)। কিন্তু তিনি তো অক্ষম নন। শুধু তিনি যা এরাদা করেন, তা-ই সংঘটিত হয়। একমাত্র তিনি-ই সকল জিনিসের স্রষ্টা। আর এটাই আল্লাহতায়া'লার সত্তা মোবারক। “মানুষ এটা সৃষ্টি করেছে” কিংবা “আমরা এটা সৃষ্টি করেছি” কিংবা “তারা এটা সৃষ্টি করেছে” ইত্যাদি কথার মতো কথা বলা অথবা লিখা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। আল্লাহতায়া'লার প্রতি এটা দুর্ব্যবহার (হাকিকী অর্থে সৃষ্টি ক্ষমতা যেহেতু তাঁরই)। বস্তুতঃ এটা কুফর বা অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
= সমাপ্ত =
_____________
কিতাবঃ ঈমান ও ইসলাম
মূল: মওলানা খালেদ আল-বাগদাদী (رحمة الله)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
🌍 ইসলামী বিশ্বকোষ এপ্স।
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.islamboi.rizwan]
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন